All news

গবেষণায় বিনিয়োগ পেলে নদীর বালুই হবে মহামূল্যবান সম্পদ

গবেষণায় বিনিয়োগ পেলে নদীর বালুই হবে মহামূল্যবান সম্পদ
  • বাংলাদেশের পদ্মা-যমুনা-তিস্তার বালুতে রয়েছে কোয়ার্টজের বিশাল ভাণ্ডার। ল্যাবরেটরিতে সেই বালু থেকে ৯৯.৫ শতাংশ বিশুদ্ধ সিলিকা উৎপাদন সম্ভব হয়েছে। সঠিক দীর্ঘমেয়াদি কৌশল গ্রহণ করলে বাংলাদেশও বৈশ্বিক সেমিকন্ডাক্টর সরবরাহব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ স্থান করে নিতে পারে বলে জানান ভূতত্ত্ববিদ ও বাংলাদেশ ভূতাত্বিক জরিপ অধিদপ্তরের উপপরিচালক (ভূতত্ত্ব) ড. মো. সোহেল রানা

প্রশ্ন : সম্প্রতি আপনার একটি গবেষণা পর্যালোচনা নিবন্ধে বাংলাদেশের নদীর বালুকে ‘সেমিকন্ডাক্টর শিল্পের সম্ভাবনাময় কাঁচামাল’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। সেটির মূল বার্তাটি কী?

উত্তর : আমাদের গবেষণার মূল বার্তা হলো বাংলাদেশের ব্রহ্মপুত্র, যমুনা, পদ্মা ও তিস্তা নদীর বালুতে প্রচুর পরিমাণে কোয়ার্টজ রয়েছে।

এই কোয়ার্টজ থেকেই মূলত সিলিকন তৈরি হয়, আর সিলিকন হলো সেমিকন্ডাক্টর চিপের প্রধান উপাদান। বিশ্বের সেমিকন্ডাক্টর শিল্পের প্রায় ৯০ শতাংশই সিলিকনভিত্তিক। তাই আমাদের নদীর বালু যদি উচ্চ-শুদ্ধতার কোয়ার্টজ (High-Purity Quartz) উৎপাদনে সক্ষম হয়, তাহলে এটি বাংলাদেশের জন্য এক বিশাল অর্থনৈতিক সুযোগ তৈরি করতে পারে।

প্রশ্ন : নদীর বালু থেকে কী পরিমাণ বিশুদ্ধতা অর্জন করা সম্ভব?

উত্তর : সাম্প্রতিক ল্যাবরেটরি পরীক্ষায় দেখা গেছে, সাধারণ প্রক্রিয়াকরণের মাধ্যমে আমাদের নদীর বালু থেকে ৯৯.৫ শতাংশ বিশুদ্ধতার সিলিকা উৎপাদন সম্ভব।

এই বিশুদ্ধতা কাচশিল্পের জন্য যথেষ্ট ভালো। তবে সেমিকন্ডাক্টর-গ্রেড সিলিকন ওয়েফার উৎপাদনের জন্য প্রয়োজন ৯৯.৯৯ শতাংশ বা তারও বেশি বিশুদ্ধতা, যাকে ‘৯এন’ও বলা হয়। অর্থাৎ কাচশিল্পের সিলিকা আর সেমিকন্ডাক্টরের সিলিকার মধ্যে বিস্তর পার্থক্য রয়েছে।

প্রশ্ন : তাহলে বাংলাদেশের বালু কি সেমিকন্ডাক্টর গ্রেডের মান পূরণ করতে পারবে?

উত্তর : এটাই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।

আমাদের বালু কাচশিল্পের মান পূরণ করলেও চিপ উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় কঠোর বিশুদ্ধতার মান পূরণ করে কি না তা এখনো বৈজ্ঞানিকভাবে নিশ্চিত নয়। আয়রন, অ্যালুমিনিয়াম, টাইটানিয়ামের মতো অতিক্ষুদ্র মাত্রার অমিশ্রণ বা স্ফটিকগত ত্রুটি চিপ উৎপাদনে বড় সমস্যা তৈরি করতে পারে। এ জন্য এখন প্রয়োজন অতিক্ষুদ্র অমিশ্রণ বিশ্লেষণ এবং পাইলট-স্কেল পরিশোধন প্রযুক্তি।

প্রশ্ন : তাহলে বাংলাদেশের জন্য কোন পথটি বেশি বাস্তবসম্মত?

উত্তর : বাংলাদেশের একটি ধাপভিত্তিক কৌশল গ্রহণ করা উচিত। সরাসরি বিপুল অর্থ বিনিয়োগ করে চিপ কারখান স্থাপন করা অত্যন্ত ব্যয়বহুল ও ঝুঁকিপূর্ণ।

তার চেয়ে প্রথম পর্যায়ে আমাদের ফোকাস হওয়া উচিত উচ্চ-শুদ্ধতার সিলিকা উৎপাদন, ইন্টিগ্রেটেড সার্কিট (আইসি) ডিজাইন এবং সেমিকন্ডাক্টর অ্যাসেম্বলি ও টেস্টিং  খাতে। এতে বিনিয়োগের ঝুঁকি কমবে এবং বিপুলসংখ্যক প্রকৌশলী ও দক্ষ জনশক্তির কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে।

প্রশ্ন : আপনার গবেষণায় একটি ‘স্যান্ড প্রসেসিং অ্যান্ড রিসার্চ সেন্টার’ প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব এসেছে। এটি কী ভূমিকা রাখবে?

উত্তর : এই সেন্টার হবে একটি বিশেষায়িত গবেষণা কেন্দ্র, যেখানে পাইলট-স্কেল খনিজ প্রক্রিয়াকরণ, রাসায়নিক পরিশোধন এবং উন্নত উপকরণ বৈশিষ্ট্যায়নের সুবিধা থাকবে। এই কেন্দ্রটি আমাদের নদীর বালু থেকে উচ্চ-শুদ্ধতার সিলিকা ও মেটালজিক্যাল গ্রেড সিলিকন উৎপাদনের কারিগরি ও বাণিজ্যিক সম্ভাব্যতা যাচাই করবে। পাশাপাশি তরুণ প্রকৌশলীরা এখানে হাই-পিউরিটি মিনারেল অ্যানালিসিস, ভিএলএসআই ডিজাইন ও মিনারেল হাতে-কলমে অভিজ্ঞতা অর্জন করতে পারবেন। এটি মেধা পলায়ন রোধ করবে এবং দেশের প্রযুক্তিগত আত্মনির্ভরশীলতায় ভূমিকা রাখবে।

গবেষণায় বিনিয়োগ পেলে নদীর বালুই হবে মহামূল্যবান সম্পদ

প্রশ্ন : এই সেন্টার প্রতিষ্ঠায় সরকার কী ধরনের উদ্যোগ নিয়েছে?

উত্তর : মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের একটি প্রস্তাব আছে এই কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করার। সেটা নিয়ে আমরা কাজ করছি। এ উদ্যোগ সফল হলে দেশীয় উচ্চ প্রযুক্তিশিল্পের বিকাশের নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হতে পারে। তবে এ জন্য প্রয়োজন পর্যাপ্ত বাজেট বরাদ্দ, আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি স্থানান্তর এবং দক্ষ মানবসম্পদ উন্নয়ন। প্রস্তাবিত রোডম্যাপ অনুযায়ী, প্রথম পাঁচ বছর খনিজ জরিপ ও পাইলট সুবিধা পরিচালনার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হবে।

প্রশ্ন : সিলিকা বালু থেকে সেমিকন্ডাক্টর তৈরির বিশ্বে কোনো গবেষণা আছে কি?

উত্তর : ইউএস ডিপার্টমেন্ট অফ ট্রান্সপোর্টেশন ২০১০ সালে এই বিষয়ে ‘আপগ্রেডিং সিলিকা সেন্ড টু মেটালজিক্যাল গ্রেড সিলিকন’ শীর্ষক একটি গবেষণা করেছে। গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে সিলিকা থেকে মেটালজিক্যাল গ্রেড সিলিকন তৈরি করা সম্ভব হতে পারে।

প্রশ্ন : আমাদের দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য কী হওয়া উচিত?

উত্তর : আমাদের প্রস্তাবিত জাতীয় রোডম্যাপ ২০২৬ থেকে ২০৫০ সাল পর্যন্ত পাঁচটি ধাপে বিভক্ত। প্রথম ধাপে সারা দেশে কোয়ার্টজ অনুসন্ধান ও ঝচজঈ প্রতিষ্ঠা; দ্বিতীয় ধাপে উচ্চ শুদ্ধতার সিলিকার বাণিজ্যিক উৎপাদন ও আইসি ডিজাইন সক্ষমতা শক্তিশালীকরণ; তৃতীয় ও চতুর্থ ধাপে পাইলট ওয়েফার ফ্যাব্রিকেশন এবং দেশীয় চিপ উৎপাদন সুবিধা প্রতিষ্ঠা এবং পঞ্চম ধাপে উদ্ভাবননির্ভর উচ্চ প্রযুক্তি অর্থনীতি গড়ে তোলা। সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করতে পারলে ২০৫০ সালের মধ্যে বাংলাদেশ বৈশ্বিক সেমিকন্ডাক্টর শিল্পের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হতে পারে।

প্রশ্ন : সেমিকন্ডাক্টরে কিভাবে দেশের কৌশলগত সম্পদ হতে পারে?

উত্তর : সেমিকন্ডাক্টর এখন আর শুধু বাণিজ্যিক পণ্য নয়, এটি জাতীয় নিরাপত্তা ও প্রযুক্তিগত সার্বভৌমত্বের কৌশলগত সম্পদ। আমাদের হিমালয় থেকে আগত কোয়ার্টজসমৃদ্ধ বালু একটি কৌশলগত সম্পদ। এই সম্পদকে যদি আমাদের মানবসম্পদের সঙ্গে সঠিকভাবে সমন্বয় করা যায়, তাহলে বাংলাদেশ বৈশ্বিক সেমিকন্ডাক্টর বিপ্লবে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারবে। তবে এ জন্য এখনই পদক্ষেপ নিতে হবে। গবেষণা, বিনিয়োগ এবং নীতিগত সহায়তা—তিনটি ক্ষেত্রেই আমাদের এগিয়ে যেতে হবে।