লোকগানের এক মুকুটহীন সম্রাজ্ঞী কিংবদন্তি শিল্পী কাঙালিনী সুফিয়া। তার কণ্ঠের মায়ায় মুগ্ধ দেশ-বিদেশের অসংখ্য শ্রোতা।
মানুষের মুখে মুখে ফেরে তার বিভিন্ন জনপ্রিয় গান। সারা জীবন গান গেয়েছেন, কোটি শ্রোতার হৃদয়ে স্থায়ী জায়গা করে নিয়েছেন। তবে জীবনের শেষ প্রান্তে এসে চরম অর্থকষ্ট, অসুস্থতা ও অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটছে তার।
কিছুদিন আগে বাথরুমে পা পিছলে পড়ে কাঙালিনী সুফিয়ার বাঁ হাত ভেঙে যায়।
আর্থিক অসচ্ছলতার কারণে হাসপাতালে চিকিৎসা না নিয়ে প্রতিবেশীদের ঝাড়-ফুঁক ও গাছগাছড়ার চিকিৎসার ওপরই নির্ভর করতে হয় তাকে। তবে অবস্থার অবনতি হলে বুধবার সকালে তাকে রাজবাড়ী জেলা সদর হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে তার হাতে প্লাস্টার করা হয়।
শিল্পী কাঙালিনী সুফিয়ার মানবেতর জীবনের খবর ছড়িয়ে পড়লে তার পাশে দাঁড়ায় আনভীর বসুন্ধরা গ্রুপ ফাউন্ডেশন। শিল্পীর চিকিৎসার জন্য তাকে নগদ অর্থ সহায়তা দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি ভবিষ্যতেও প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ও সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।

বুধবার (২৪ জুন) সন্ধ্যায় শিল্পীর বাড়িতে যান আনভীর বসুন্ধরা গ্রুপ ফাউন্ডেশনের চিফ কো-অর্ডিনেটর মো. আমিনুল ইসলাম। তিনি শিল্পীর খোঁজখবর নেন এবং প্রয়োজনীয় সহায়তা পৌঁছে দেন। পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে ভবিষ্যতে চিকিৎসা ও অন্যান্য প্রয়োজনেও পাশে থাকার আশ্বাস দেন।
রাজবাড়ী সদর উপজেলার আলীপুর ইউনিয়নের কল্যাণপুর বিলপাড়া এলাকায় বসবাস করছেন কাঙালিনী সুফিয়া। সেখানেই কাটছে তার জীবনের শেষ অধ্যায়। বয়সের ভারে নুয়ে পড়া শিল্পীর শরীরে বাসা বেঁধেছে হৃদরোগ, কিডনি জটিলতা, উচ্চ রক্তচাপসহ নানা রোগ। নিয়মিত চিকিৎসা ও ওষুধের প্রয়োজন হলেও অর্থসংকটের কারণে তা সম্ভব হচ্ছে না।
কালের কণ্ঠের রাজবাড়ী প্রতিনিধি শিল্পীর নিজ বাড়িতে গিয়ে তার সঙ্গে কথা বলেন। অসুস্থ ও বয়সের ভারে ন্যুব্জ শিল্পী। ঠিকমতো যেন কথা বলতেও কষ্ট হয় তার। তিনি জানান, দুর্ঘটনার দিন তিনি বাড়িতে একাই ছিলেন। রাতে বাথরুমে পড়ে গিয়ে কিছু সময়ের জন্য অচেতন হয়ে পড়েন। জ্ঞান ফিরলে বাঁ হাতে খুব ব্যথা অনুভব করেন এবং হাত নাড়াতে পারছিলেন না। ওই অবস্থায় রাত কাটান। পরদিন সকালে প্রতিবেশী নারী বিবি হাওয়ার কাছে গেলে তিনি ঝাড়-ফুঁক ও গাছগাছড়ার চিকিৎসা দেন।
যে কণ্ঠে সুরের জাদু, সে কণ্ঠে দুঃখের কথা জানিয়ে কাঙালিনী সুফিয়া বলেন, ‘সেদিন ঘরে কোনো টাকাও ছিল না। পাশে ছিল না আমার মেয়ে পুষ্পও। তাই ঝাড়-ফুঁক আর গাছগাছড়ার চিকিৎসাই ছিল আমার একমাত্র ভরসা।’
প্রতিবেশী বিবি হাওয়া বলেন, ‘ঘটনার পরদিন সকালে কাঙালিনী সুফিয়া আমার কাছে আসেন। আমি তার হাতের অবস্থা দেখে ঝাড়-ফুঁক ও কিছু গাছগাছড়ার চিকিৎসা দিই। আমি সামান্য কবিরাজি জানি, তাই মানবিক কারণেই তাঁকে সাহায্য করেছি।’
কাঙালিনী সুফিয়ার একমাত্র মেয়ে পুষ্প বেগম। গানের অনুষ্ঠানে মা কাঙালিনী সুফিয়া গান করেন আর মেয়ে পুষ্প মায়ের সঙ্গে থেকে মন্দিরা বাজান। পুষ্প জানান, কাজের প্রয়োজনে তিনি ঢাকায় ছিলেন। দুর্ঘটনার খবর পেয়ে দ্রুত বাড়ি ফিরলেও অর্থসংকটের কারণে মাকে সঙ্গে সঙ্গে হাসপাতালে নিতে পারেননি। পরে প্রশাসনের উদ্যোগে বুধবার সকালে রাজবাড়ী জেলা সদর হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসকরা তার হাতে প্লাস্টার করেন।
পুষ্প আরো জানান, সরকারি উদ্যোগে তার মায়ের নামে ২০ শতাংশ জমি দেওয়া হয়েছে। ২০১৫ সালে সেখানে দুই কক্ষ ও একটি বাথরুমসহ একটি টিনশেড পাকা ঘর নির্মাণ করে দেওয়া হয়। ২০২৩ সালে নির্মাণ করা হয় সুফিয়া একাডেমির জন্য আরেকটি টিনশেড ভবন এবং বার্ষিক অনুষ্ঠান আয়োজনের জন্য একটি উন্মুক্ত মঞ্চ। তবে এখনো মঞ্চের ছাদ ও বাউন্ডারি নির্মাণ হয়নি।
একসময় সরকারি ভাতা, সাংস্কৃতিক অনুদান এবং বিভিন্ন অনুষ্ঠানে গান গেয়ে যা আয় হতো, তা দিয়ে কোনোমতে সংসার চলত। তবে বয়স ও অসুস্থতার কারণে এখন আর নিয়মিত মঞ্চে উঠতে পারেন না তিনি। সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানও কমে গেছে। ফলে আয়ের পথ প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে।
অভিযোগের সুরে কালের কণ্ঠকে পুষ্প বলেন, ‘সরকারি উদ্যোগে মা প্রতি মাসে ১০ হাজার টাকা ভাতা পেতেন। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর সেই ভাতা বন্ধ হয়ে যায়। অসুস্থতার কারণে মা এখন আর নিয়মিত অনুষ্ঠান করতে পারেন না। ফলে আর্থিক সংকট নিত্যসঙ্গী হয়ে দাঁড়িয়েছে।’
তিনি আরো বলেন, ‘মায়ের সার্বক্ষণিক দেখভালের জন্য একজন নার্স বা সহকারী প্রয়োজন। পাশাপাশি তাঁর রচিত প্রায় ৫০০টি গান সংরক্ষণ ও লিপিবদ্ধ করা জরুরি। কারণ এখনো তিনি নতুন গান রচনা করেন।’
আনভীর বসুন্ধরা গ্রুপ ফাউন্ডেশনের সহায়তার ঘোষণাকে স্বাগত জানিয়ে পুষ্প বলেন, ‘মায়ের অসুস্থতার খবরে এবিজি বসুন্ধরা ফাউন্ডেশন পাশে দাঁড়িয়েছে, এটা আমাদের জন্য বড় স্বস্তির বিষয়। আশা করছি, এবার মা সঠিক চিকিৎসা পেয়ে সুস্থ হয়ে উঠবেন।’
রাজবাড়ীর জেলা প্রশাসক আফরোজা পারভীন বলেন, ‘কাঙালিনী সুফিয়ার পাশে প্রশাসন সব সময় রয়েছে। আমরা তার দ্রুত সুস্থতা কামনা করছি। আনভীর বসুন্ধরা গ্রুপ ফাউন্ডেশনও তার পাশে দাঁড়িয়েছে জেনে আমরা আনন্দিত।’
রাজবাড়ী জেলার বালিয়াকান্দি উপজেলার রামদিয়া গ্রামে জেলে পরিবারে কাঙালিনী সুফিয়ার জন্ম। তাঁর প্রকৃত নাম টুনি হালদার। ১৪ বছর বয়সেই গ্রামের অনুষ্ঠানে গান গেয়ে মানুষের নজর কাড়েন। তাঁর গানের গুরু গৌর মহন্ত ও দেবেন খ্যাপা। হালিম বয়াতির কাছেও গান শিখেছিলেন কাঙালিনী সুফিয়া। এ পর্যন্ত ৩০টি জাতীয় ও ১০টি আন্তর্জাতিক পুরস্কার পেয়েছেন। ‘কোনবা পথে নিতাইগঞ্জ যাই’, ‘বুড়ি হইলাম তোর কারণে’, ‘নারীর কাছে কেউ যায় না’, ‘আমার ভাটি গাঙের নাইয়া’সহ বেশ কিছু জনপ্রিয় গানের শিল্পী তিনি।
SOURCE : কালের কণ্ঠপ্রয়াত ও অসুস্থ ৪ সাংবাদিককে ২০ লাখ টাকা অনুদান দিল এবিজি ফাউন্ডেশন
ABG Foundation Provides Tk 20 Lakh Financial Assistance to 4 Deceased and Ill Journalists
নদী ভাঙনকবলিত অসহায়দের পাশে আনভীর বসুন্ধরা গ্রুপ ফাউন্ডেশন
Anvir Bashundhara Group Foundation Stands by River Erosion Victims
বাসযোগ্য ঢাকা গড়তে এবিজি ও ডিএনসিসির পারস্পরিক সহযোগিতার আশ্বাস
DNCC Eyes 'Bashundhara Residential Area' as Model for Building a Liveable Dhaka
Bangladesh Could Become Semiconductor Hub by 2050
নদীর বালু থেকে সেমিকন্ডাক্টর শিল্পের সম্ভাবনা
Anvir Bashundhara Group Foundation Brings Smiles to Orphans’ Faces
এতিম শিশুদের মুখে হাসি ফোটাচ্ছে আনভীর বসুন্ধরা গ্রুপ ফাউন্ডেশনের মানবিক উদ্যোগ